অংশ ৬: অব্যাহতি, বাদ ও কর অবকাশ · প্রথম অধ্যায়: অব্যাহতি, হ্রাস ও বাদ
ধারা ৭৬ — কর অব্যাহতি
Income Tax Act, 2023 · Section 76
আইনের মূল পাঠ
১[৭৬। (১) সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, কোনো শ্রেণির ব্যক্তিকে বা কোনো শ্রেণির যেকোনো আয়কে কর অব্যাহতি প্রদান করিতে পারিবে।
(২) যেইক্ষেত্রে এই আইন ব্যতীত অন্য কোনো আইন বা আইন হিসাবে পরিগণিত অন্য কোনো আইনগত দলিলের বিধানানুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে কর অব্যাহতি প্রদান করা হইয়াছে, সেইক্ষেত্রে, উক্তরূপ অন্য আইনে বা আইনগত দলিলে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপ-ধারা (১) এর অধীন জারীকৃত প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে কর অব্যাহতি প্রদান করা না হইলে উক্তরূপ বিধান কার্যকর হইবে না।
(৩) সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যেকোনো কর অব্যাহতি বাতিল করিতে পারিবে।
(৪) এই আইনের অধীন কোনো কর অব্যাহতি ভূতাপেক্ষভাবে প্রদান করা যাইবে না।
(৫) ধারা ১৬৬ এবং ধারা ১৭১ এর বিধানাবলি পরিপালনপূর্বক রিটার্ন দাখিলের ব্যর্থতায় কোনো ব্যক্তির আয় কোনো করবর্ষে কর অব্যাহতি প্রাপ্ত হইবে না:
তবে শর্ত থাকে যে, ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ১ এর দফা (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (১৭) ও (৩৫) এবং চাকরি হইতে আয় পরিগণনায় কর অব্যাহতি সংক্রান্ত ক্ষেত্রে এই উপ-ধারার বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
(৬) কোনো ব্যক্তি কোনো একটি উৎসের আয়ের বিপরীতে আইন দ্বারা নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদে কর অব্যাহতি প্রাপ্ত হইলে উক্তরূপ উৎসের আয়ের বিপরীতে পুনরায়, অন্য কোনোভাবে বা অন্য কোনো মেয়াদে, কর অব্যাহতি প্রাপ্ত হইবে না এবং উক্তরূপ কোনো ব্যক্তি কোনো প্রকারের একীভূতকরণ, ডিমার্জার ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে পুনর্গঠিত হইলেও উক্তরূপ কর অব্যাহতি প্রাপ্ত হইবে না:
তবে শর্ত থাকে যে, যেইক্ষেত্রে এই আইনের মাধ্যমে কোনো কর অব্যাহতির বিদ্যমান মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়, সেইক্ষেত্রে এই উপ-ধারার বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
(৭) কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত কোনো উৎসের আয় বা ব্যক্তির আয় পরিগণনার ক্ষেত্রে, ধারা ৫৫ এর অধীন অননুমোদিত কোনো ব্যয়ের উপর ধারা ৫৬ এর বিধান অনুযায়ী কর প্রদেয় হইবে।]
সহজ ভাষায় বুঝুন
মেন্টরের নোট · Unidara Associates
কোন আয় করমুক্ত হবে, তা ঠিক করার ক্ষমতা সরকারের, আর তা করতে হবে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে। অন্য কোনো আইনে “করমুক্ত” লেখা থাকলেও এই ধারার অধীন প্রজ্ঞাপন না থাকলে সেই অব্যাহতি কাজ করবে না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা: রিটার্ন জমা না দিলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সুবিধাও পাওয়া যাবে না।
ধাপে ধাপে বুঝি
- ১কর অব্যাহতি মানে কোনো আয়ের উপর কর না দেওয়া, বা কম দেওয়া। এটা একটা সুবিধা, অধিকার নয়। তাই আইন বলেছে, এই সুবিধা দেবে শুধু সরকার, আর তা দিতে হবে লিখিতভাবে, গেজেটে প্রকাশ করে।
- ২অনেক আইন (যেমন কোনো বিশেষ খাতের আইন) নিজের মধ্যে কর সুবিধার কথা লেখে। উপ-ধারা (২) বলছে: আয়কর আইনের ধারা ৭৬(১) এর অধীন প্রজ্ঞাপন না থাকলে সেই সুবিধা কার্যকর হবে না। অর্থাৎ সব কর সুবিধার একটাই দরজা, এই ধারা।
- ৩সরকার যেমন অব্যাহতি দিতে পারে, তেমনি প্রজ্ঞাপন দিয়ে বাতিলও করতে পারে (উপ-ধারা ৩)। তবে অব্যাহতি পেছনের তারিখ থেকে (ভূতাপেক্ষভাবে) দেওয়া যায় না (উপ-ধারা ৪)। যে বছর চলে গেছে, সেই বছরের জন্য পরে প্রজ্ঞাপন দিয়ে অব্যাহতি দেওয়া যাবে না।
- ৪উপ-ধারা (৫) সবচেয়ে বেশি মানুষের উপর প্রভাব ফেলে। ধারা ১৬৬ ও ১৭১ মেনে রিটার্ন জমা না দিলে, সেই করবর্ষে আপনার আয় কর অব্যাহতি পাবে না। মানে যে আয় করমুক্ত হওয়ার কথা ছিল, রিটার্ন না দিলে তার উপরও কর বসতে পারে।
- ৫তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে: ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ১ এর দফা (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (১৭) ও (৩৫) এর অব্যাহতি, আর চাকরির আয়ের অব্যাহতি। এগুলো রিটার্ন না দিলেও হারায় না।
- ৬উপ-ধারা (৬): কেউ একটি উৎসের আয়ের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে অব্যাহতি একবার পেলে, সেই একই উৎসে আবার অন্যভাবে বা নতুন মেয়াদে পাবে না। কোম্পানি একীভূতকরণ, ডিমার্জার বা অধিগ্রহণ করে নতুন রূপে এলেও না। তবে আইনই যদি মেয়াদ বাড়ায়, সেটা আলাদা কথা।
- ৭উপ-ধারা (৭): করমুক্ত প্রতিষ্ঠানও ধারা ৫৫ অনুযায়ী অননুমোদিত খরচ করলে, সেই খরচের উপর ধারা ৫৬ অনুযায়ী কর দিতে হবে। করমুক্ত মানে খরচের নিয়ম না মানার লাইসেন্স নয়।
মনে রাখুন
- অব্যাহতি দেয় শুধু সরকার, গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে।
- অন্য আইনের অব্যাহতি কার্যকর হতে ধারা ৭৬(১) এর প্রজ্ঞাপন লাগবে।
- অব্যাহতি পেছনের তারিখ থেকে দেওয়া যায় না, কিন্তু সরকার যেকোনো সময় বাতিল করতে পারে।
- রিটার্ন না দিলে করমুক্ত আয়ের সুবিধা হারানোর ঝুঁকি (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)।
- একই উৎসে একবারের বেশি মেয়াদি অব্যাহতি নয়, পুনর্গঠন করেও নয়।
উদাহরণ ১: রিটার্ন না দিলে করমুক্ত আয়ও হারাতে পারেন
- ১জনাব হাবিব এমন একটি আয় পান যা ষষ্ঠ তফসিলে করমুক্ত, কিন্তু উপ-ধারা (৫) এর ব্যতিক্রম তালিকায় নেই।
- ২তিনি ভাবলেন, “আয় তো করমুক্ত, রিটার্ন দেওয়ার দরকার নেই।” কিন্তু তার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ছিল (ধারা ১৬৬)।
- ৩রিটার্ন না দেওয়ায় সেই করবর্ষে তার আয় অব্যাহতি পাবে না। কর কর্মকর্তা ওই আয়ের উপরও কর দাবি করতে পারেন।
- ৪শিক্ষা: আয় করমুক্ত হলেও রিটার্ন সময়মতো দিন, আর করমুক্ত আয় রিটার্নের নির্দিষ্ট কলামে দেখান।
উদাহরণ ২: অন্য আইনে সুবিধা, কিন্তু প্রজ্ঞাপন নেই
- ১একটি প্রতিষ্ঠান দাবি করল, তাদের খাতের একটি বিশেষ আইনে লেখা আছে তারা আয়করমুক্ত।
- ২কিন্তু ধারা ৭৬(১) এর অধীন সরকার কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করেনি।
- ৩ফলে ধারা ৭৬(২) অনুযায়ী সেই বিশেষ আইনের অব্যাহতি কার্যকর হবে না। প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ নিয়মে কর দিতে হবে।
উদাহরণ ৩: একীভূত হয়ে নতুন করে অব্যাহতি নেওয়া যায় না
- ১একটি কোম্পানি ৫ বছর একটি প্রকল্পের আয়ে অব্যাহতি ভোগ করল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আরেকটি কোম্পানির সাথে একীভূত হয়ে নতুন নামে আবার অব্যাহতি চাইল।
- ২উপ-ধারা (৬) অনুযায়ী একই উৎসের আয়ে নতুন মেয়াদে অব্যাহতি পাবে না, একীভূতকরণের পরেও না।
প্র্যাকটিশনারের পরামর্শ
কোনো আয় করমুক্ত মনে হলে আগে দেখুন সেটা ষষ্ঠ তফসিলে বা সরকারি প্রজ্ঞাপনে আছে কিনা। তারপর রিটার্ন সময়মতো জমা দিয়ে আয়টা “মোট আয় হইতে বাদ” কলামে দেখান। এই দুটো কাজ করলে সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থাকে না।
সাম্প্রতিক পরিবর্তন
পুরো ধারা ৭৬ অর্থ (২০২৫-২০২৬ অর্থ বৎসর) আইন, ২০২৬ দিয়ে নতুন করে লেখা হয়েছে। অব্যাহতির একমাত্র পথ গেজেট প্রজ্ঞাপন, ভূতাপেক্ষ অব্যাহতি নিষেধ, রিটার্ন না দিলে অব্যাহতি হারানো, একই উৎসে দ্বিতীয়বার অব্যাহতি নিষেধ, আর অননুমোদিত খরচে কর, এসব এখন আইনে স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
নীতি, প্রশাসন, আইন ও হিসাব, চার দিক থেকে
নীতিগত উদ্দেশ্য: আইনটা কেন এমন
কর ব্যয় (tax expenditure) মানে অব্যাহতির কারণে সরকারের যে রাজস্ব ছেড়ে দেওয়া হয়। বছরের পর বছর বিভিন্ন আইন, এসআরও আর নির্বাহী আদেশে অব্যাহতি ছড়িয়ে পড়ায় কর ভিত্তি সংকুচিত হয়েছিল এবং কোন অব্যাহতি বৈধ, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। নতুন ধারা ৭৬ এর মূল নীতি চারটি: এক, সব অব্যাহতি একটি দরজা দিয়ে, গেজেট প্রজ্ঞাপনে; দুই, ভূতাপেক্ষ অব্যাহতি নিষেধ, যেন রাজস্বের হিসাব পেছন থেকে বদলানো না যায়; তিন, রিটার্ন না দিলে অব্যাহতি নেই, যা কর পরিপালনকে অব্যাহতির পূর্বশর্ত বানায়; চার, একই উৎসে বারবার অব্যাহতি বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে অব্যাহতি নবায়ন বন্ধ করা।
কর কর্মকর্তার দৃষ্টিতে
কর নির্ধারণে অব্যাহতি দাবি এলে তিনটি প্রশ্ন: প্রজ্ঞাপন কোনটি এবং তা ধারা ৭৬(১) এর অধীন কিনা; সংশ্লিষ্ট করবর্ষে প্রজ্ঞাপন বলবৎ ছিল কিনা; আর করদাতা ধারা ১৬৬ ও ১৭১ মেনে রিটার্ন দিয়েছেন কিনা। তৃতীয়টি না হলে, ব্যতিক্রম তালিকার বাইরে, অব্যাহতি অগ্রাহ্য করে কর নির্ধারণ করা যায়।
আয়কর আইনজীবীর দৃষ্টিতে
বিরোধের প্রধান ক্ষেত্র তিনটি: প্রজ্ঞাপন বাতিলের পর চলমান প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুবিধা (legitimate expectation) টিকে কিনা; “রিটার্ন দাখিলের ব্যর্থতা” বলতে দেরিতে দাখিলও বোঝায় কিনা (ধারা ১৭১ সহ পড়তে হবে); আর পুনর্গঠনের পর “একই উৎসের আয়” কিনা। এসব প্রশ্নে ধারার ভাষা ও প্রজ্ঞাপনের শর্ত খুঁটিয়ে পড়ে যুক্তি সাজাতে হয়।
হিসাবরক্ষক ও CA এর দৃষ্টিতে
করমুক্ত আয়ের প্রতিটি উৎসের জন্য প্রজ্ঞাপন নম্বর, মেয়াদ আর শর্তের একটি রেজিস্টার রাখুন। করমুক্ত প্রতিষ্ঠানেও ধারা ৫৫ এর খরচের সীমা প্রয়োগ করে ধারা ৫৬ অনুযায়ী করের হিসাব আলাদা করুন।
কর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে
অব্যাহতি-নির্ভর ব্যবসায়িক মডেলে “বাতিলের ঝুঁকি” হিসাবের অংশ রাখুন, কারণ সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে যেকোনো সময় অব্যাহতি বাতিল করতে পারে। আর পরিবারের যে সদস্যের আয় করমুক্ত, তারও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে সময়মতো রিটার্ন দিন।
সাধারণ ভুল
- করমুক্ত আয় আছে বলে রিটার্ন না দেওয়া বা দেরিতে দেওয়া।
- পুরোনো এসআরও বা অন্য আইনের ভিত্তিতে অব্যাহতি দাবি করা, ধারা ৭৬(১) এর প্রজ্ঞাপন না দেখে।
- মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনর্গঠন করে নতুন অব্যাহতি আশা করা।
করণীয় চেকলিস্ট
- প্রতিটি অব্যাহতির উৎস (প্রজ্ঞাপন বা তফসিলের দফা) লিখে রাখুন।
- রিটার্ন ধারা ১৭০ এর সময়সীমার মধ্যে দাখিল করুন।
- করমুক্ত আয় রিটার্নের নির্দিষ্ট কলামে দেখান।
প্রশ্নোত্তর
দেরিতে রিটার্ন দিলে কি অব্যাহতি হারাব?
উপ-ধারা (৫) বলে ধারা ১৬৬ ও ১৭১ এর বিধান মেনে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে অব্যাহতি পাওয়া যাবে না। দেরিতে দাখিল কীভাবে বিবেচিত হবে, তা ধারা ১৭১ ও প্রাসঙ্গিক বিধানের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। ঝুঁকি এড়াতে সময়মতো দাখিলই নিরাপদ।
চাকরির আয়ের করমুক্ত অংশ কি রিটার্ন না দিলে হারাব?
না। উপ-ধারা (৫) এর শর্তাংশে চাকরির আয়ের কর অব্যাহতিকে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। তবে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে না দেওয়ার জন্য অন্য জরিমানা প্রযোজ্য হতে পারে (ধারা ২৬৬)।
সাথে পড়ুন
এই বিশ্লেষণ Unidara Associates এর শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা, NBR এর দাপ্তরিক মত নয়। আপনার নির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে পরামর্শ নিন।
