অংশ ৩: কর আপিল ট্রাইব্যুনাল
ধারা ১৩ — কর আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা
Income Tax Act, 2023 · Section 13
আইনের মূল পাঠ
১৩। (১) এই আইনের অধীন আপিল ট্রাইব্যুনালের কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সরকার একজন প্রেসিডেন্ট এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য সমন্বয়ে, সময় সময়, কর আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করিবে।
(২) কোনো ব্যক্তি আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসাবে নিযুক্ত হইবেন না, যদি না-
(ক) তিনি কোনো সময়ে বোর্ডের সদস্য হইয়া থাকেন বা বর্তমানে বোর্ডের সদস্যের দায়িত্বে থাকেন;
১[(খ) তিনি জেলা ও দায়রা জজ অথবা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কর্মরত আছেন;]
(গ) তিনি কর কমিশনার হইয়া থাকেন;
(ঘ) তিনি ধারা ৩২৭ এর অধীন কর আইনজীবী এবং পেশাগতভাবে আয়কর কার্যালয়ে অন্যূন ১০ (দশ) বৎসরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হন; বা
(ঙ) তিনি পেশাগতভাবে আর্থিক ও কর সংক্রান্ত আইনের খসড়া প্রণয়ন কার্যে বিশেষজ্ঞ এবং অন্যূন ১০ (দশ) বৎসরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হন;
(৩) সরকার, আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের মধ্য হইতে একজন সদস্যকে, যিনি বোর্ডের সদস্য ২[***] আছেন, প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করিবে।
সহজ ভাষায় বুঝুন
মেন্টরের নোট · Unidara Associates
সরকার কর আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে, যেখানে থাকবেন একজন প্রেসিডেন্ট ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য। কারা সদস্য হতে পারবেন, তার যোগ্যতাও এই ধারায় দেওয়া আছে।
মনে রাখুন
- কর কমিশনার (আপিল) এর রায়ে সন্তুষ্ট না হলে করদাতা পরের ধাপে এই ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন।
- সদস্য হতে পারবেন: NBR এর বর্তমান বা সাবেক সদস্য, কর্মরত জেলা ও দায়রা জজ বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, কর কমিশনার, অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞ কর আইনজীবী (ধারা ৩২৭), অথবা কর আইনের খসড়া প্রণয়নে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ।
- প্রেসিডেন্ট হবেন সদস্যদের মধ্যে এমন একজন, যিনি বর্তমানে NBR এর সদস্য।
উদাহরণ: আপিলের ধাপ
- ১ধাপ ১: উপকর কমিশনার কর নির্ধারণ করলেন, আপনি একমত নন।
- ২ধাপ ২: কর কমিশনার (আপিল) এর কাছে আপিল করলেন, রায় আপনার বিপক্ষে গেল।
- ৩ধাপ ৩: এবার কর আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল। এখানে বিচারক ও কর বিশেষজ্ঞ মিলে বেঞ্চ শুনানি করে।
প্র্যাকটিশনারের পরামর্শ
প্রতিটি আপিলের নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। আগের ধাপের রায় হাতে পাওয়ার দিন থেকে সময় গুনুন, দেরি হলে আপিলের সুযোগ হারাতে পারেন।
সাম্প্রতিক পরিবর্তন
অর্থ (২০২৫-২০২৬ অর্থ বৎসর) আইন, ২০২৬ দিয়ে দফা (খ) প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এখন কর্মরত জেলা ও দায়রা জজ বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সদস্য হতে পারেন। আর অর্থ আইন, ২০২৪ দিয়ে প্রেসিডেন্টের যোগ্যতা থেকে “ছিলেন বা” শব্দগুলো বাদ গেছে, ফলে সাবেক নয়, বর্তমান NBR সদস্যই প্রেসিডেন্ট হবেন।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
নীতি, প্রশাসন, আইন ও হিসাব, চার দিক থেকে
নীতিগত উদ্দেশ্য: আইনটা কেন এমন
কর বিরোধে প্রথম আপিল হয় প্রশাসনের ভেতরেই (কমিশনার আপিল)। দ্বিতীয় ধাপে একটি স্বতন্ত্র ও মিশ্র গঠনের ফোরাম দরকার, যেখানে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিচারিক ও পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। কর আপিল ট্রাইব্যুনাল সেই ফোরাম। সদস্যপদে NBR সদস্য, কর কমিশনার, জেলা ও দায়রা জজ, অভিজ্ঞ কর আইনজীবী আর আইন প্রণয়ন বিশেষজ্ঞ রাখার উদ্দেশ্য হলো তথ্যগত ও আইনগত দুই ধরনের প্রশ্নই যথাযথভাবে বিচার হওয়া। সাম্প্রতিক সংশোধনে কর্মরত জেলা ও দায়রা জজদের যুক্ত করা বিচারিক উপাদান শক্তিশালী করার দিকে একটি পদক্ষেপ।
কর কর্মকর্তার দৃষ্টিতে
উপকর কমিশনারও কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে আপিল কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন (ধারা ২৯১(৪))। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনাল দুই পক্ষেরই ফোরাম।
আয়কর আইনজীবীর দৃষ্টিতে
ট্রাইব্যুনাল মূলত তথ্যের শেষ ফোরাম। এর পর হাইকোর্টে যায় শুধু আইনের প্রশ্ন। তাই সব প্রমাণ, দলিল আর তথ্যগত যুক্তি ট্রাইব্যুনাল পর্যায়েই পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করতে হবে। নতুন প্রমাণ পরে আনা কঠিন।
হিসাবরক্ষক ও CA এর দৃষ্টিতে
আপিল প্রস্তুতিতে সংশ্লিষ্ট বছরের আর্থিক বিবরণী, আয় পরিগণনাপত্র, উৎসে করের সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর কর নির্ধারণ আদেশের প্রতিটি সংযোজনের বিপরীতে হিসাবের ব্যাখ্যা একটি পেপারবুকে সাজিয়ে নিন।
কর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে
ট্রাইব্যুনালে আপিলের খরচ এখন কম: বিরোধপূর্ণ করের মাত্র ৩% আগে দিতে হয়। তবুও মামলার যোগ্যতা, সম্ভাব্য সময় আর সুদের ঝুঁকি বিবেচনা করে ADR এর সাথে তুলনা করুন।
পূর্ণ আপিল ব্যবস্থা: কোন ধাপে কোথায়, কত দিনে
- ১ধাপ ১: উপকর কমিশনারের কর নির্ধারণ বা জরিমানার আদেশ। করদাবি নোটিশ জারির দিন থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে আপিল আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল, ফি ২০০ টাকা (ধারা ২৮৬–২৮৭)।
- ২ধাপ ২: আপিল আয়কর কর্তৃপক্ষের আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে, আদেশ অবহিত হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে কর আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল, ফি ১,০০০ টাকা (ধারা ২৯১)।
- ৩ট্রাইব্যুনালে আপিলের শর্ত: আপিল কর্তৃপক্ষের আদেশে ধার্য কর আর আপনার স্বীকৃত করদায়ের পার্থক্যের ৩% আগে পরিশোধ করতে হবে (অর্থ আইন, ২০২৬ এর আগে ছিল ১০%)।
- ৪ধাপ ৩: ট্রাইব্যুনালের আদেশ থেকে আইনের প্রশ্ন উঠলে, আদেশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে রেফারেন্স। করদাতার ক্ষেত্রে ফি ২,০০০ টাকা, আর ট্রাইব্যুনালের আদেশে ধার্য কর ও স্বীকৃত করদায়ের পার্থক্যের ১০% আগে পরিশোধ করতে হয় (ধারা ২৯৩)। এরপর আপিল বিভাগে আপিল (ধারা ২৯৫)।
- ৫বিকল্প পথ: আপিলের বদলে বা পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR), আলোচনার মাধ্যমে সমাধান (ধারা ২৯৭ থেকে)।
হিসাব: ট্রাইব্যুনালে যেতে আগে কত টাকা দিতে হবে
- ১কমিশনার (আপিল) এর আদেশের পর ধার্য কর ২০,০০,০০০ টাকা। আপনার রিটার্নে স্বীকৃত করদায় ১২,০০,০০০ টাকা।
- ২পার্থক্য = ৮,০০,০০০ টাকা। এর ৩% = ২৪,০০০ টাকা।
- ৩ট্রাইব্যুনালে আপিলের আগে এই ২৪,০০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে (আগের ১০% নিয়মে লাগত ৮০,০০০ টাকা)।
সাধারণ ভুল
- ৬০ দিনের সময়সীমা পার করে ফেলা। দেরিতে আপিল গ্রহণ ট্রাইব্যুনালের বিবেচনার উপর নির্ভর করে, এবং পর্যাপ্ত কারণ দেখাতে হয়।
- ৩% পরিশোধ না করে আপিল দায়ের করা। এই অবস্থায় আপিল গ্রহণযোগ্য নয়।
- প্রথম আপিলে প্রমাণ না দিয়ে ট্রাইব্যুনালে নতুন প্রমাণ নিয়ে যাওয়া।
করণীয় চেকলিস্ট
- কমিশনার (আপিল) এর আদেশ পাওয়ার তারিখ লিখে রাখুন, ৬০ দিনের হিসাব সেখান থেকে।
- ধার্য কর আর স্বীকৃত করদায়ের পার্থক্যের ৩% পরিশোধ করে চালান সংযুক্ত করুন।
- নির্ধারিত ফরম, ১,০০০ টাকা ফি আর পেপারবুক প্রস্তুত করুন।
- আপিলের কারণগুলো আইনের ধারা ধরে স্পষ্টভাবে লিখুন।
প্রশ্নোত্তর
ট্রাইব্যুনালে কি নিজে মামলা চালানো যায়?
আইনে করদাতা নিজে বা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হাজির হতে পারেন (ধারা ৩২৭)। তবে ট্রাইব্যুনালে আইন ও তথ্যের জটিল যুক্তি লাগে, তাই অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবী বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের সহায়তা নেওয়াই বাস্তবসম্মত।
ট্রাইব্যুনালের পরে আর কোথায় যাওয়া যায়?
ট্রাইব্যুনালের আদেশ থেকে উদ্ভূত আইনি প্রশ্নে, আদেশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে রেফারেন্স করা যায় (ধারা ২৯৩), তারপর আপিল বিভাগে আপিল (ধারা ২৯৫)। রেফারেন্সের সুযোগ শুধু আইনি প্রশ্নে, তাই তথ্যের বিরোধে কার্যত ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
সাথে পড়ুন
এই বিশ্লেষণ Unidara Associates এর শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা, NBR এর দাপ্তরিক মত নয়। আপনার নির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে পরামর্শ নিন।
